শিরোনাম

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (BMDA) বিরুদ্ধে ২০ বছর ধরেকোটি টাকার টেন্ডার দুর্নীতির অভিযোগ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে


বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (BMDA), রাজশাহী শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী জনাব মোহাম্মদ তোফাজ্জল আলী সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অস্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এককভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, ২০০৪ সাল থেকে ‘সানাকোষ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান BMDA-তে প্রিপেইড মিটার সরবরাহের একচেটিয়া অধিকার পেয়ে আসছে, যেখানে অন্যকোনো যোগ্য প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, প্রিপেইড মিটার ক্রয় ও পরিচালনা সংক্রান্ত দুর্নীতির সঙ্গে মোহাম্মদ তোফাজ্জল আলী ও খালেকুজ্জামানের নাম বারবার উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, অবসরে যাওয়ার পর খালেকুজ্জামান সরাসরি সানাকোষ কোম্পানিতে যোগ দেন, যাতে টেন্ডার সংক্রান্ত সুবিধা অব্যাহত থাকে।
BMDA-র আওতাধীন বিভিন্ন স্থানে নিম্নমানের প্রিপেইড মিটার সরবরাহ করা হচ্ছে, যা প্রায়শই বিকল হয়ে যায়। পরবর্তীতে নামমাত্র মূল্যের কম্পোনেন্ট ব্যবহার করে মেরামত করা হলেও তা উচ্চমূল্যে বিল করা হয়। এভাবে একদিকে সাধারণ জনগণ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০০৯-১০ সালে তানোর ও গোদাগাড়ী এলাকায় কার্ড ছাড়া পাম্প চলায় ব্যাপক দুর্নীতি ও চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে সানাকোষ কোম্পানি প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনকে গোপনে কয়েক লাখ টাকা জরিমানা দেয়। এই ঘটনায় আব্দুল বারিক নামের এক মেকানিককে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ পাওয়া যায়, যদিও তার দাবি ছিল-ত্রুটিপূর্ণ মিটারই সমস্যার মূল কারণ।
তবে, বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা। ভুক্তভোগী আব্দুল বারিক জানান, “আমি ত্রুটিপূর্ণ মিটারের কারণে চাকরিচ্যুত হয়েছি, এমনকি ১৫ দিনের জেলও খাটতে হয়েছে। অথচ, দোষ মিটারের, আমার নয়। আমি মটর চালিয়ে পিকনিকে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রিপেইড মিটারের টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মটর বন্ধ হয়নি। এটা অবশ্যই একটা ত্রুটিযুক্ত মিটার। ওই সময়ে আমারটা সহ আরও তিন যায়গায় একই ঘটনা ঘটে।”

অভিযোগ রয়েছে, BMDA তাদের প্রিপেইড মিটার টেন্ডারে অন্যকোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ না দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন অনৈতিকতার আশ্রয় নেয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ দেশের সকল পাওয়ার ইউটিলিটি সংস্থাগুলো প্রিপেইড মিটারিং নীতি প্রণয়নকরী ও ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম।

পাওয়ার ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানগুলি সকল প্রিপেইড মিটার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গুলিকে সুবিধা দেবার লক্ষ্যে প্রিপেইড মিটার সফটওয়্যার ও তাদের সার্ভারের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য দরপত্রে নির্দিষ্ট টেকনিক্যাল ডাটা (যেমন API, Port, IP ইত্যাদি) প্রদান করে, যাতে যেকোনো ব্র্যান্ডের মিটার ওই সার্ভারের সাথে কাজ করতে পারে। তবে, BMDA প্রিপেইড সফটওয়্যারের (সানাকোশের সরবরাহকৃত), এসব টেকনিক্যাল ডাটা অনুপস্থিত থাকলেও, একমাত্র সানাকোষ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ তা সমন্বয় করা সম্ভব নয়, এবং এই তথ্য ছাড়া মিটার ডাটাবেস সফটওয়্যারের সাথে সমন্বয় অসম্ভব। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করলেও অভিযোগ রয়েছে যে, BMDA পূর্বনির্ধারিত স্যাম্পলের সাথে শুধুমাত্র সানাকোষের নমুনাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করে। অন্য প্রতিষ্ঠানের সময় বৃদ্ধির আবেদন গ্রহণ করা হয়নি, ফলে শেষ পর্যন্ত এককভাবে সানাকোষই টেন্ডার পায়।
অভিযোগ রয়েছে, BMDA-র নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তোফাজ্জল আলী এই দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। রাজশাহীতে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণসহ নামে বেনামে তার অসংখ্য অবৈধ সম্পত্তি রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে মোহাম্মদ তোফাজ্জল আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দুর্নীতির বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং দাবি করেন, “সানাকোষ নয়, আরও অনেক কোম্পানি টেন্ডার পেয়েছে। টেন্ডার তিনটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আহ্বান করা হয়, এতে যে কেউ অংশ নিতে পারে।”
সানাকোষের প্রিপেইড মিটারে পূর্বে কিছু সমস্যা হয়েছিল, সেজন্য তারা জরিমানাও দিয়েছিল বলে তিনি স্বীকার করেন।অন্যদিকে, তৎকালীন প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলবেন বলে এড়িয়ে যান।
৫ আগস্ট বর্তমান সরকারের পরিবর্তন হলেও BMDA-র অধিকাংশ পরিচালক বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কতটা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে? অভিযোগ রয়েছে, BMDA-র প্রজেক্ট ডিজাইন এমনভাবে করা হয় যাতে শুধুমাত্র সানাকোষই টেন্ডার পেতে পারে। অনেক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নামকরা কোম্পানি আধুনিক প্রযুক্তির মিটার সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করলেও কারিগরি জটিলতার ফাঁদে ফেলে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় না। ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট দফতরের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই অস্বচ্ছতা দূর হবে না। সুতরাং, সরকারি প্রকল্পে একক প্রতিষ্ঠানকে একাধারে ২০ বছর ধরে কাজ পাইয়ে দেওয়া দুর্নীতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে বলে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানসমূহ জানিয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে BMDA-র টেন্ডার প্রক্রিয়া যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ও দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

মো: তোফাজ্জল আলী সরকার, নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দ্বায়িত্ব)। সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগদানের পর কয়েকমাস ভোলাহাট জোনে কর্মরত থাকার পর প্রধান কার্যালয়ে বদলী হয়ে আসেন এবং অদ্যবধি (প্রায় ২০ বছর) প্রি-পেইড মিটার শাখায় কর্মরত আছেন।
তার হাত ধরেই বিএমডিএতে প্রি-পেইড মিটার ব্যবস্থার যাত্রা শুরু। এ ব্যবস্থার বাস্তবায়নকারী একটাই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠন “সানাকোষ এ্যাসোসিয়েটস্”। প্রতিটি মিটার আনুমানিক ৪০০০০.০০ হাজার টাকা দরে মোট ক্রয়কৃত মিটারের পরিমান কুড়ি (২০০০০) হাজারেরও বেশি। এই মিটারিং সিস্টেমে প্রকল্প পরিচালকগন শুধু নাম সর্বস্ব ভূমিকা পালন করে থাকেন। বিএমডিএ’র প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান চেয়ারম্যান ড. এম. আসাদুজ্জামানের অত্যন্ত ঘনিষ্ট এ কর্মকর্তা দাপটের সাথেই প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত আছেন। প্রি-পেউড মিটারের কারিগরী বিনির্দেশ এমনভাবে তৈরী করা যাতে সানাকোষ এ্যাসোসিয়েট ব্যতীত অন্য কোন প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ গ্রহণ করতে না পারে। এ যাবৎ প্রি-পেইড মিটার ক্রয়ের যাবতীয় দরপত্র তফশীল দেখলেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। এবিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে আনুমানিক ২০০৮ সনের দিকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে সানাকোষ এ্যাসোসিয়েটস এর একই মালিকানাধী অপর ২টি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ৩ টি প্রতিষ্ঠানকে সর্ট লিষ্টিং করে দরপত্র আহবান করা হয় যা আনুমানিক ২০১২ পর্যন্ত বলবৎ থাকে। সার্বিকভাবে সানাকোষ এ্যাসোসিয়েটস ব্যতীত অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে মিটার ক্রয় করা হয়নি। ব্যতীক্রম শুধু রংপুর সার্কেলে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প পরিচালক। তিনি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রি-পেইড মিটার ক্রয়করায় তিনি জনাব তোফাজ্জল আলী সরকারসহ চেয়ারম্যান ড. এম. আসাদুজ্জামানের তোপের মুখে আছেন।
মিটার ছাড়াও মিটারের রক্ষনাবেক্ষনের জন্য প্রয়োজনী খুচরা যন্ত্রাংশের জন্যও বিএমডিএ সংগত কারনেই সানাকোষ এ্যাসোেিয়টস এর উপর নির্ভরশীল বিধায় উক্ত প্রতিষ্ঠানের বেধে দেয়া মূল্যেই তা ক্রয় করা হয়ে থাকে। প্রি-পেইড মিটার ব্যবস্থাপনায় বিএমডিএ এখন উক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে।
উক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০০৮ পরবর্তী প্রধান কার্যালয়সহ ১৬ টি উপজেলায় নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য আনুমানিক ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে মোবাইল টাওয়ার নির্মান করা হয়। উক্ত টাওয়ার সমূহ কখনই ব্যবহাওে আসেনি। পরবর্তীতে জনাব মো: তোফাজ্জল আলী সরকার আনুমানিক ২০১৬-১৭ সনের দিকে বিএমডিএ’র তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক, চেয়ারম্যান ও তার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা গ্রহনকারী কতিপয় কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে টাওয়ারগুলো ডিজম্যান্টল করা হয়।
তিনি সার্বিক ভাবে সানাকোষ এ্যাসোসিয়েটসকে একচেটিয়া কাজ দিয়ে আর্থিক লাভবান হয়েছেন। রাজশাহী শহরে ২টি বহুতল ভবনসহ গ্রামে বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।
অতি সম্প্রতি তিনি পূর্বের ধারাবাহিকতায় দরপত্র আহবান করে কয়েকটি দরপত্রের বিপরীতে সানাকোষ এ্যাসোসিয়েটস কে কার্যাদেশ দেন। এবিষয়ে অপর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভিয়োগের জন্য তৎপর হওয়ায় তা সামাল দেয়ার প্রত্যয়ে তিনি জনাব মো: জাহাঙ্গীর আলম খানের নেতৃত্বাধীন বৈশম্য বিরোধী জোটে শরীক হন এবং গত ২৩/০৩/২০২৫ তারিখ নির্বাহী পরিচালক জনাব মো: শফিকুল ইসলামকে শরীরিক হেনস্তার মাধ্যমে দ্বায়িত্ব হস্তান্তর পত্রে স্বাক্ষর করানোর পর দপ্তর থেকে বের করে দেওয়ার কাজের সংগঠকদের একজন এবং তার সক্রিয় অংশগ্রহনের প্রমান স্বরুপ প্রধান কার্যালয়ের সিসি টিভি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রনকারী হিসেবে ঘটনার সিসি টিভি ক্যামেরার ডিরেকশন পরিবর্তণ ও ফুটেজ গায়েব।